স্বাগত পোপ ফ্রান্সিস

নিউজ ইভেন্ট২৪/জ. হাসান

৩০ নভেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১০:৩০

শান্তি ও সম্প্রীতির বাণী নিয়ে এবং ভালোবাসা দিয়ে মানুষকে সেবা করার আহ্বান জানাতে আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে আসছেন পোপ ফ্রান্সিস। খ্রিষ্টান ধর্মের রোমান ক্যাথলিক শাখার প্রধান ধর্ম গুরু পোপ ফ্রান্সিস তিন দিনের সফরে আজ বিকালে মিয়ানমার থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছাবেন।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে ৩১ বছরে কোনো পোপের এটাই হবে প্রথম বাংলাদেশ সফর। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশে ভ্যাটিক্যান দূতাবাস পোপের সফরের সকল প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে। তাকে স্বাগত জানাতে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক সাজ-সজ্জা ও প্রস্তুতি।

ঢাকায় পোপকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। তিনি ভিভিআইপি প্রটোকল ও নিরাপত্তা পাচ্ছেন। সফরসঙ্গীদের মধ্যে প্রায় ১০০ সাংবাদিক-সহ তিন শতাধিক সদস্য রয়েছে। ১৯৮৬ সালে পোপ জন পল দ্বিতীয় বাংলাদেশ সফর করেছিলেন।

বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার পোপের

পোপের বাংলাদেশ সফর বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। যে কোনো দেশে পোপের সফরকে মর্যাদাপূর্ণ বলে মনে করা হয়। গত তিন বছরে পোপের তিন দেশ সফরের মধ্যে একটি বাংলাদেশ। গত দেড় বছর ধরে পোপের বাংলাদেশ সফর নিয়ে আলোচনা চলছিল। পোপও বাংলাদেশে আসার সুবিধাজনক সময় খুঁজছিলেন। অবশেষে আজ তার সফরটি হচ্ছে। বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ও উদার বহুত্ত্ববাদী বৈশিষ্ট্য পোপ’কে বাংলাদেশ সফরে আগ্রহী করেছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন আর ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্য দেখতে আগ্রহী। ঋতুর বৈচিত্র্য বিবেচনায় সবচেয়ে অনুকূল সময় হিসেবে নভেম্বরকেই বেছে নেওয়া হয়। মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সফরের উদ্দেশ্যে রোম ত্যাগের আগে এক ভিডিও বার্তায় পোপ বলেন, বাংলাদেশ সফরের প্রস্তুতির লগ্নে আমি দেশটির গোটা জনগোষ্ঠীকে শুভেচ্ছা ও বন্ধুত্বের বার্তা দিতে চাই। আমি এমন একটি মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছি যখন আমরা সবাই একত্রিত হব। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় চার লাখ ক্যাথলিক খ্রিষ্টান বসবাস করছে এবং একজন কার্ডিনাল রয়েছেন।

অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব পোপ ফ্রান্সিস

পোপ ফ্রান্সিস ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ ২৬৬তম পোপ নির্বাচিত হন। বর্তমান পোপ ফ্রান্সিসের প্রধান কার্যালয় রোম শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত ভ্যাটিকান সিটি। রোমের বিশপ হিসেবে, তিনি বিশ্বব্যাপী ক্যাথলিক চার্চ এবং সার্বভৌম ভ্যাটিকান সিটি উভয়েরই প্রধান। খ্রিষ্টানদের সোসাইটি অব জেসাস নামক ধর্মসংঘের প্রথম পোপ হলেন ফ্রান্সিস। একইসঙ্গে তিনি পুরো আমেরিকান অঞ্চলের প্রথম পোপ, দক্ষিণ গোলার্ধের প্রথম পোপ এবং অষ্টম শতকে সিরীয় নাগরিক তৃতীয় গ্রেগরির পর ইউরোপের বাইরে থেকে হওয়া প্রথম পোপ-ও তিনি। পোপ নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সেইন্ট ফ্রান্সিস অব অসিসি’কে সম্মান দেখিয়ে নিজের নাম বেছে নেন।

পোপ ফ্রান্সিসের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনার বুয়েনেস আইরেসে। জন্মের পর তার নাম রাখা হয় জর্জ মারিও বেরগোগলিও। রোমান ক্যাথলিক যাজকদের প্রশিক্ষণ কলেজে পড়াশোনার আগে তিনি কিছুদিন রাসায়নিক প্রযুক্তিবিদ ও নাইট ক্লাবের ‘বাউন্সার’ হিসেবে কাজ করেন। ক্যাথলিক পুরোহিত হিসেবে তার অভিষেক হয় ১৯৬৯ সালে। বুয়েনোস আইরেসের আর্চবিশপ হন ১৯৯৮ সালে এবং পোপ জন পল দ্বিতীয় তাকে ২০০১ সালে কার্ডিনাল করেন। কার্ডিনাল হওয়ার মাধ্যমে তিনি ক্যাথলিক ধর্মসঙ্ঘে পোপের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অধিকারী হন।

পোপ হওয়ার পর তিনি তাঁর বিনয়ী ভাবমূর্তির জন্য সারা বিশ্বের নজর কেড়েছেন। তিনি দায়িত্বহীন উন্নয়নের যেমন বিরোধিতা করে আসছেন তেমনি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপেও সমর্থন যুগিয়েছেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে সহায়তা করেছেন। একইসঙ্গে অভিবাসন সংকট নিয়েও সোচ্চার তিনি।

পোপ ফ্রান্সিস গত বছরের অক্টোবরে নতুন ১৭ ধর্মযাজককে কার্ডিনাল মনোনীত করেন যার মধে?্য বাংলাদেশের আর্চবিশপ প?্যাট্রিক ডি রোজারিও রয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে তিনিই প্রথম কার্ডিনাল হন। অর্থাত্ পরবর্তী পোপ নির্বাচনে একজন বাংলাদেশিও ভোট দেবেন। এই কার্ডিনালদের মধ?্য থেকেই পরবর্তী পোপ নির্বাচিত হবেন।

পোপের ৫০ ঘণ্টার কর্মব্যস্ত সফর

ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস আজ বিকাল ৩টায় মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটযোগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বিমানবন্দরে পোপকে স্বাগত জানাবেন। বিমানবন্দরে তাঁকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হবে। বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে সাভারের জাতীয় স্মৃতি সৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন তিনি। এরপর ধানমন্ডিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন পোপ। সেখান থেকে যাবেন বঙ্গভবনে। রাষ্ট্রপতি মো.আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করবেন তিনি। সন্ধ্যায় বঙ্গভবনেই মন্ত্রী, বিশিষ্ট নাগরিক, সুশীল সমাজ, কূটনৈতিকদের সঙ্গে পোপ সাক্ষাত্ করবেন এবং বক্তব্য রাখবেন।

পোপ ফ্রান্সিসের সফরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব হলো সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানের প্রার্থনা সভা। আগামীকাল শুক্রবার সকাল ১০টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খ্রিস্টধর্মীয় উপাসনা ও যাজকদের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন এবং ভাষণ দেবেন পোপ ফ্রান্সিস। সেখানে ৮০ হাজার পুণ্যার্থী যোগ দেবেন। বাঁশ, কাঠ আর ছনের তৈরি ৮০ ফুট বাই ৫০ ফুটের কুঁড়েঘরের আদলে নির্মিত মঞ্চে বসে পোপ ভক্তদের নিয়ে প্রার্থনা করবেন। তিনি প্রার্থনায় শান্তি ও সম্প্রীতির ওপর জোর দেবেন। বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে ঢাকায় ভ্যাটিকান দূতাবাসে যাবেন তিনি। সেখানে পোপের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাত্ করবেন। বিকাল ৪টায় কাকরাইলে রমনা ক্যাথেড্রাল পরিদর্শন করবেন তিনি। এরপর প্রবীণ যাজক ভবনে বাংলাদেশের বিশপদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করবেন এবং বক্তব্য রাখবেন। বিকাল ৫টায় কাকরাইলের আর্চ বিপশ হাউজের মাঠে শান্তির জন্য আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃমাণ্ডলিক সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন পোপ।

শনিবার সকাল ১০টায় তেজগাঁও মাদার তেরেজা ভবন পরিদর্শন করবেন পোপ ফ্রান্সিস। সেখানে তেজগাঁও গির্জার যাজক, ব্রাদার-সিস্টার, সেমিনারিয়ান ও নবিশদের সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন তিনি। এরপর তেজগাঁও সমাধিস্থল ও পুরনো গির্জা পরিদর্শন করবেন। বিকাল তিনটায় রাজধানীর নটর ডেম কলেজে যুব সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন। এদিনই বিকাল ৫টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইটে করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থেকে রোমের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন পোপ ফ্রান্সিস। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী বিমানবন্দরে তাঁকে বিদায় জানাবেন।

এছাড়া সফরকালে পোপ রোহিঙ্গাদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাত্ করবেন। বাংলাদেশ ক্যাথলিক বিশপ সম্মিলনির প্রেসিডেন্ট কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি. রোজারিও বলেন, পোপের এ সফর অনেক আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। তখন রোহিঙ্গা ইস্যুটি ছিল না। রোহিঙ্গা ইস্যু পরে সৃষ্টি হয়েছে, যা এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

পোপকে স্বাগত জানিয়ে গণতান্ত্রিক লীগের সভা

পোপ ফ্রান্সিসের বাংলাদেশ সফরকে স্বাগত জানিয়ে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেছে জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ। গতকাল সাংবাদিক নির্মল সেন মিলনায়তনে এ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন জাতীয় পার্টি-জেপি’র নির্বাহী সম্পাদক সাদেক সিদ্দিকী। সভাপতিত্ব করেন গণতান্ত্রিক লীগের সভাপতি এম.এ জলিল। বক্তব্য রাখেন অ্যাডভোকেট কাজী এম. সাজাওয়ার হোসেন। সাদেক সিদ্দিকী বলেন, পোপ ফ্রান্সিস মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। তিনি শোষিত ও নির্যাতিত মানুষের পক্ষে কাজ করেন। তিনি বাংলাদেশ সফরে এসে এদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে মূল্যায়ন করেছেন।

 

 


প্রতিদিনের খবরগুলো ফেসবুকে পেতে নিচের লাইক অপশনে ক্লিক করুন-

Logo

সম্পাদক: পল্লব মুনতাকা। জ্যাকম্যান, মেডওয়ে, ইউএসএ
ইমেইল: mail.newsevent24@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | newsevent24 2017