ধুলার কবলে ঢাকার ৯০ শতাংশ মানুষ

নিউজ ইভেন্ট২৪/আর

২২ নভেম্বর ২০১৭,বুধবার, ২৩:২৫

ধুলার কবলে ঢাকার ৯০ শতাংশ মানুষ

ধুলার কবলে ঢাকার ৯০ শতাংশ মানুষ

গাবতলীর বেড়িবাঁধ সড়ক হয়ে প্রতিদিনই হাজারীবাগ চামড়াপল্লীতে নিজ কর্মস্থলে যান  রশীদ; কিন্তু প্রতিদিনই তাঁকে ধুলার মুখোমুখি হতে হয়। নষ্ট হয় জামা-কাপড়।

চুলে ধুলা, মুখে ধুলা, ধুলা সারা শরীরে। নিজের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তিনি বলেন, ‘ধুলার কারণে প্রতিদিনই নানা বিড়ম্বনা পোহাতে হয়। চোখে-মুখে ধুলা ঢোকে। তবুও যেতে হচ্ছে। ’


একই ভোগান্তির শিকার ঢাকার বনানীর বেসরকারি এক অফিসের জনসংযোগ কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় চলতে-ফিরতে সবখানেই ধুলার ছড়াছড়ি। কোথাও বিশুদ্ধ বাতাস নেই। ধুলার উপদ্রবে জীবনযাপন সত্যিই অসহনীয়। ’ এ রকম নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে দিন পার করছেন ঢাকার বেশির ভাগ মানুষ।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের তথ্যমতে, ঢাকা মহানগরীর ৯০ শতাংশ মানুষ ধূলিদূষণের শিকার, বিশেষ করে শীত মৌসুমে ধূলিদূষণের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত। ফলে বৃদ্ধি পায় নানা ধরনের রোগ-ব্যাধি।


পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী—বর্তমান সময়ে ঢাকা মহানগরীর একিউআই (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স) তিন শর ওপরে। অনুমোদিত একিউআই ০-৫০ ভালো, ৫১-১০০ সহনীয়, ১০১-১৫০ সতর্ক পর্যায়, ১৫১-২০০ অস্বাস্থ্যকর, ২০১-৩০০ খুব অস্বাস্থ্যকর, ৩০১-৫০০ অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ৯১টি দেশের ১৬০০ শহরের মধ্যে বায়ুদূষণের দিক থেকে সবচেয়ে দূষিত ২৫টি নগরীর মধ্যে বাংলাদেশের তিনটি নগরী (ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ) রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের অবস্থান ১৭তম, গাজীপুর ২১তম এবং ঢাকা ২৩তম।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুমে হাজার হাজার ইটভাটার পাশাপাশি মহানগরীতে সঠিক পরিকল্পনা ব্যতীত কোনো সমন্বয় ছাড়াই গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, ড্রেনেজ, রাস্তাঘাট উন্নয়নসহ সেবামূলক বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে নতুন ভবন নির্মাণকাজ এ মৌসুমেই বেশি শুরু হয়। ড্রেন পরিষ্কার করে রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা, দোকানপাট ও গৃহস্থালির আবর্জনা যেখানে-সেখানে ফেলে রাখা, মেরামতহীন ভাঙাচোরা রাস্তায় যানবাহন চলাচল, পুরনো ভবন ভাঙা, নতুন ভবন তৈরির ইট-বালু ও পাথর, মেশিনে ইট ভাঙা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ধোঁয়া ধূলিদূষণের প্রধান উৎস। ’

তিনি আরো বলেন, ‘শীত মৌসুমে ধূলিদূষণ বেশি মাত্রায় হয়। প্রথম কারণ হলো—এ সময় আবহাওয়া শুষ্ক থাকে। দ্বিতীয় কারণ হলো কুয়াশায় ধুলাবালি বেশি দূর যেতে পারে না। একই জায়গায় ঘুরপাক খায়। ’

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান মতে, ঢাকা মহানগরীর প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে ধূলিদূষণের কারণে প্রতি মাসে চার হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। ধূলিদূষণের ফলে মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ইমারত, কলকারখানা, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন স্থাপনায় মরিচা পড়ে সেগুলোর আয়ুষ্কাল কমে যাচ্ছে। ধুলায় দোকানের জিনিসপত্র, কম্পিউটারসহ নানা ইলেকট্রনিকস সামগ্রী দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ঘরবাড়ি, আসবাবপত্রসহ কাপড়চোপড়ে ধুলা জমে যেভাবে প্রতিদিন নগরজীবন নোংরা করছে, তা পরিচ্ছন্ন রাখতেও নগরবাসীকে নষ্ট করতে হচ্ছে হাজার হাজার শ্রমঘণ্টা এবং বিপুল পরিমাণ পানি ও ডিটারজেন্ট। আর এসব পরিষ্কারক দ্রব্যের পরবর্তী গন্তব্য হচ্ছে নদী, লেক, জলাধার, যা জলজ প্রাণীসহ সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্যও ক্ষতিকর।

বিসিএসআইআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘ঢাকায় ধূলিদূষিত বাতাস শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে সর্দি-কাশি, ফুসফুস ক্যান্সার, ব্রংকাইটিস, শ্বাসজনিত কষ্ট, হাঁপানি, যক্ষ্মা, অ্যালার্জি, চোখ জ্বালা, মাথা ব্যথা, বমিভাব, চর্মরোগসহ নানা জটিল রোগের সৃষ্টি করছে। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় ধূলিদূষণের ফলে তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য একটি মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। ’

তিনি বলেন, শহরের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে অচিরেই ধূলিদূষণের উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে। পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের লাইনের খোঁড়াখুঁড়ির সময় যাতে ধূলিদূষণ না হয়, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। ভবন নির্মাণ ও ভাঙার সময় যথাযথ নিয়ম মেনে তা করতে হবে। ড্রেনের ময়লা এবং রাস্তা ঝাড়ু দিয়ে ময়লা-আবর্জনা জমিয়ে না রেখে সঙ্গে সঙ্গে তা অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। গৃহস্থালি ও বাজারের ময়লা সঠিক নিয়মে দ্রুত সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ’

ঢাকা শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক এম নাজমুল ইসলাম বলেন, ধূলিদূষণের কারণে বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও আক্রান্ত হয়। ধূলিদূষণের কারণে শিশুদের শ্বাসকষ্টজনিত রোগ বেড়ে যায়। শিশুস্বাস্থ্য বিভাগে রোগীর প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি শ্বাসকষ্টজনিত বিভিন্ন রোগে ভর্তি হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না হলে ধুলার দূষণ থেকে নিস্তার মিলবে না। ঢাকা মহানগরীর অন্যান্য দূষণের মতো ধূলিদূষণ মোকাবেলায় প্রতিরোধব্যবস্থা জোরালো হওয়া জরুরি। ’

পরিবেশ নিয়ে কাজ করে যাওয়া সংগঠন ইয়ুথ সানের সভাপতি মাকিবুল হাসান বাপ্পী বলেন, ‘পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে সব পরিষেবা কার্যক্রমের জন্য রাস্তা একবার খনন করা। পরিষেবার সম্প্রসারণ, সংযোগ, মেরামত ও নতুন সংযোগ স্থাপনের সময় রাস্তার খননকৃত মাটি সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে ফেলা এবং দ্রুত রাস্তা মেরামত করতে হবে। ধূলিদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন হলেই শুধু ধূলিদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ’

 

সূত্রঃ কবির আলমিগির/কালের কণ্ঠ

 

 


প্রতিদিনের খবরগুলো ফেসবুকে পেতে নিচের লাইক অপশনে ক্লিক করুন-

Logo

সম্পাদক: পল্লব মুনতাকা। জ্যাকম্যান, মেডওয়ে, ইউএসএ
ইমেইল: mail.newsevent24@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | newsevent24 2017