কৌশল নির্ধারনে জামায়াতে দ্বন্দ্ব চরমে

নিউজ ইভেন্ট২৪

১২ অক্টোবর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০৮:৫৩

জামায়াত লগো

জামায়াত লগো

প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে ক্রান্তিকাল পার করছে জামায়াতে ইসলামী। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দলটির শীর্ষ ও আধ্যাত্মিক নেতার বেশিরভাগই ফাঁসি হয়েছে। বাকিরা বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত অথবা বিচারকার্য চলছে।

এ ছাড়া নতুন নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব শীর্ষ নেতা গত কয়েকদিনে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে। এর বাইরে নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াত অধ্যুষিত প্রায় সব আসনেই প্রার্থীরা জড়িয়েছেন দ্বন্দ্বে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে সিন্ডিকেট আর সংস্কারপন্থিদের মধ্যেও চলছে নীরব যুদ্ধ।

দ্বন্দ্বের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতাদের গ্রেপ্তার করছে সরকার।

দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূলত ৫১ আসন টার্গেট করে নির্বাচনী কাজ শুরু করেছে দলটি। অনেকটা নীরবে মাঠ গোছাচ্ছিল দলটি। অবশ্য আগামী নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিরোধিতা করে আসছে দলের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। তাদের ধারণা, অন্তত ১৫ বছর নির্বাচনের বাইরে থেকে সংগঠনকে গতিশীল ও বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নই মঙ্গল জামায়াতের। এর জেরে সংস্কারপন্থি’দের বড় একটি অংশকেই দলটির পদ দেওয়া থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। অনেককে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়। বহিষ্কার করা হয় জামায়াতের নায়েবে আমিরকেও। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছে।

জানা যায়, ঢাকা মহানগর থেকে আগামী নির্বাচনে অন্তত একটি আসনে নির্বাচন করার টার্গেট জামায়াতের। এ ক্ষেত্রে তাদের লক্ষ্যে ঢাকা-৮ আসন। পল্টন এলাকায় দীর্ঘদিন ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন জামায়াত নেতা আবদুর রব। এ ছাড়া জামায়াতের টার্গেট যাত্রাবাড়ী এলাকার আসনটিও। এ আসনে জামায়াতের ভোট ব্যাংক রয়েছে। তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসসহ বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত। এ ছাড়া আশির দশক থেকেই পরিকল্পিতভাবে যাত্রাবাড়ী এলাকায় শক্ত ভোট ব্যাংক গড়ে তোলে দলটি। এই আসনে নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দেনদরবার চলছিল দলের মধ্যে। প্রার্থী মনোনয়ন করতেই গত ২৯ সেপ্টেম্বর বৈঠকে বসে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমির মঞ্জুরুল ইসলাম ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য আবদুস সবুর ফকির, বাংলাদেশ মসজিদ মিশনের সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা ড. খলিলুর রহমান মাদানি, ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা মাওলানা ফরিদুল ইসলাম। শেষোক্ত তিনজন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের রাজনীতি ও স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওই বৈঠক থেকেই সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়।

একইভাবে চট্টগ্রামে জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায়ও মনোনয়ন নিয়ে বিবাদ দীর্ঘদিনের। এ আসনে স্বাধীনতার পর থেকে বেশিরভাগ সময়ই জামায়াতের মনোনীত প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। তবে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় নির্বাচনে অযোগ্য হন সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শাজাহান চৌধুরী। মনোনয়ন দেওয়া হয় নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলামকে। তিনি এমপি নির্বাচিত হন। আসন্ন নির্বাচনেও তাকে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াত। এ নিয়ে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েন কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতারা। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় নেতাদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদও হয়। এতে কেন্দ্র ও চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের বড় অংশ শামসুল ইসলামের পক্ষে, আর চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ও স্থানীয় নেতৃত্ব শাহজাহান চৌধুরীর পক্ষে অবস্থান নেন। যদিও কেন্দ্র থেকে অপেক্ষাকৃত জামায়াতের শক্ত ভোট ব্যাংক চট্টগ্রাম মহানগরীর হালিশহর-ডবলমুরিং আসন থেকে নির্বাচন করার অনুরোধ করা হয় শাহজাহান চৌধুরীকে। কিন্তু তিনি এ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে সাতকানিয়ায় নির্বাচনী প্রচার অব্যাহত রাখেন। এমন দ্বন্দ্বের মধ্যে নতুন করে রসদ দেন শিবিরের সভাপতি ইয়াসির আরাফাত। তিনি প্রকাশ্যই সমর্থন দেন শামসুল ইসলামকে। এমনকি চট্টগ্রামের বিভিন্ন ঘরোয়া সভা-সমাবেশে নেতাকর্মীদের শামসুল ইসলামের পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দেন। এতে স্থানীয় নেতাদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম হয়। শিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও ইয়াসির আরাফাতের এমন পক্ষালম্বনকে ভালো চোখে দেখেননি। জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন ব্লগ ও ফেসবুকে আরাফাতের এমন কর্মকা-ের বিরোধিতা করে পোস্ট দেন। অনেকে চট্টগ্রামে আরাফাতকে অবাঞ্ছিতও ঘোষণা করেন। এমন অবস্থায় দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নেয় কেন্দ্র। পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী কেন্দ্রীয় নেতারা উত্তরার ওই বাসায় একত্রিত হন। তবে চট্টগ্রাম থেকে আসায় পৌঁছতে দেরি হয়ে যায় শাহজাহান চৌধুরী ও আ ন ম শামসুল ইসলামের। এতে গ্রেপ্তার থেকে বেঁচে যান তারা।

জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারকে তাদের ভুল কর্মকা-ের ফল বলেই ভাবছেন জামায়াতের সংস্কারপন্থি কয়েক নেতা। তাদের ভাষ্য, জামায়াতের এমন জগাখিচুড়ি মার্কা আদর্শ দিয়ে দেশে ইসলামী ভাবধারার রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। কিন্তু জামায়াতের কিছু নেতা নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছেন। এতে সরকার আবার নতুন করে গণগ্রেপ্তার শুরু করেছে। তারা বলেন, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনই ছিল জামায়াতের মঙ্গল। কিন্তু মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত দলটির কর্মীরা এখন নতুন করে হয়রানির শিকার হবেন। এটি জামায়াত নেতারাও অদূরদর্শিতার ফল বলেও মনে করেন। জামায়াত নেতাদের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই সরকার গ্রেপ্তারের সুযোগ নিচ্ছে।

এদিকে শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারে জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব পেয়েছেন অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল করা হয়েছে মাওলানা এটিএম মাসুমকে। জামায়াতের প্রথম সারির বেশিরভাগ নেতাকে আটকের মধ্য দিয়ে আবার নেতৃত্বের সংকটে উপনীত হলো দলটি। তবে এমন মুহূর্তের কোন্দল পিছু ছাড়ছে না জামায়াতের। দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে পরিচিত ও কথিত সিন্ডিকেটের সদস্য রফিকুল ইসলাম খান ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হওয়ার দৌড়ে ছিলেন। তার সাপোর্টে ছিল শিবিরের সভাপতি ও সেক্রেটারি। এ ছাড়া রফিকুলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত সিন্ডিকেট সদস্যরাও আশা করেছিলেন তিনি ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হবেন। তবে নতুন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণার পর অনেকটা মুষড়ে পড়েন। অন্য সময় জামায়াতের হরতালে আগের রাতে ব্যাপক সহিংসতা হলেও গতকাল এমন কোনো পরিস্থিতি দেখা যায়নি। জানা যায়, শিবিরের পক্ষ থেকে নির্দেশনা ছিল নামকাওয়াস্তা হরতালে মাঠে থাকবে সংগঠনটি।

জামায়াতের দাবি, গত এক মাসে জামায়াতের সারা দেশে প্রায় কয়েকশ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্যসহ বিভিন্ন জেলার আমির ও সেক্রেটারি রয়েছেন। এ ছাড়া গত কয়েকদিনে গ্রেপ্তার করা হয় কেন্দ্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী নেতাদের। দলটির এ ধরনের অবস্থার মধ্যেও স্থায়ী বহিষ্কার করা হয় রাজশাহী মহানগরের সাবেক আমির ও কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আতাউর রহমানকে। আতাউর রহমান তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ফলে সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল বেশি। আতাউর রহমানের মেয়ের জামাই ঢাকা দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তার এমন বহিষ্কার ভালোভাবে নেয়নি বহির্বিশ্ব জামায়াত। সংস্কারের দাবিতে থাকা শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবীরাও এর সক্রিয় বিরোধিতা করছেন। মূলত মুক্তিযুদ্ধ ও সংস্কার নিয়ে কথা বলায় তাকে দলটির নায়েবে আমির পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, তিনি রুকন হিসেবে থাকবেন। তবে সম্প্রতি তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়। আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে এক নারী বিবাহের অভিযোগ আনেন।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে আজ সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ঘোষণা করেছে দলটি। যদিও হরতালের পক্ষে বড় কোনো মিছিল সমাবেশ চোখে পড়েনি গতকাল রাত পর্যন্ত। বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি ঝটিকা মিছিল করেছে জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মী।

সূত্র : আমাদের সময়

 

 


প্রতিদিনের খবরগুলো ফেসবুকে পেতে নিচের লাইক অপশনে ক্লিক করুন-

Logo

সম্পাদক: পল্লব মুনতাকা। জ্যাকম্যান, মেডওয়ে, ইউএসএ
ইমেইল: mail.newsevent24@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | newsevent24 2017