চুরি করেই ওরা বিখ্যাত!

নিউজ ইভেন্ট২৪/আর

০২ অক্টোবর ২০১৭,সোমবার, ০৯:১৮

চুরি করেই ওরা বিখ্যাত!

চুরি করেই ওরা বিখ্যাত!

জুনায়েদ আব্বাসী।

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। শিক্ষকদের নারী কেলেংকারি, শিক্ষক নিয়োগ কেলেংকারি, প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেংকারি, ভর্তি পরীক্ষা কেলেংকারি ও গবেষণার জন্য বরাদ্দ টাকা কেলেংকারি সহ নানান কেলেংকারির ঘটনা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটছে।

 

তবে, অতীতের সব কেলেংকারিকে ছাপিয়ে গেছে সর্বশেষ সংঘটিত বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সামিয়া রহমানসহ আরও কয়েকজনের অন্যের গবেষণা চুরির কেলেংকারির ঘটনা। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠা ঝড় দেখে মনে হচ্ছে সাংবাদিক সামিয়া রহমানের গবেষণা চুরির ঘটনার নীচে আরও বড় ইস্যুগুলো চাপা পড়ে যাচ্ছে। শিক্ষাঙ্গন ও মিডিয়া পাড়া থেকে শুরু করে সবখানেই এখন আলোচনার বিষয় সামিয়া রহমানের গবেষণা চুরির ঘটনা।

 

জানা গেছে, ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর ‘দ্যা সাবজেক্ট অ্যান্ড পাওয়ার’ নামের একটি আর্টিকেল থেকে সামিয়া রহমান ও মারজান লেখা চুরি করেছেন। ১৯৮২ সালের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নাল ‘ক্রিটিক্যাল ইনকোয়ারি’র ৪ নম্বর ভলিউমের ১৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ফুকোর এই আর্টিকেলটি প্রকাশিত হয়েছিল। সামিয়া ও মারজানের আর্টিকেল ‘এ নিউ ডাইমেনশন অব কলোনিয়ালিজম অ্যান্ড পপ কালচার: এ কেস স্ট্যাডি অব দ্যা কালচারাল ইমপেরিয়ালিজম’ গত বছর ডিসেম্বরে ঢাবির সোশ্যাল সায়েন্স রিভিউ নামের একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়।

 

এনিয়ে যখন সারাদেশে তোলপাড়, তখন বেরিয়ে আসছে আরেক নতুন তথ্য। সামিয়া রহমান শুধু মিশেল ফুকোর লেখা চুরি করে ক্ষ্যান্ত হয়নি, চুরি করেছেন মার্কিন দার্শনিক অধ্যাপক এডওয়ার্ড সাঈদের লেখাও। জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষক সামিয়া রহমান ও মাহফুজুল হক মারজান লেখা কপি করেছেন বলে অভিযোগ পেয়েছে ঢাবি কর্তৃপক্ষ। সাঈদ একাডেমি অব প্যালেস্টাইন থেকে এ অভিযোগ করা হয় বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে। সূত্রটি জানিয়েছে, এডওয়ার্ড সাঈদের ‘কালচার অ্যান্ড ইমপেরিয়ালিজম’ এর ‘টু ভিশন ইন হার্টনেস অব ডার্কনেস’, ‘কনসোলিডেটেড ভিশন’, এবং ‘ওভারলেপিং টেরোরিস্ট, ইন্টারউইন্ড হিস্টোরিস্ট’ আর্টিকেল থেকেও লেখা কপি করা হয়েছে।

 

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপশি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও কাজ করছেন সামিয়া রহমান। বেসরকারি একটি চ্যানেলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানও পরিচালনা করেন সামিয়া রহমান। সামিয়া রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হলেও তাকে কেউ চিনতো না। মুজাম্মেল বাবুর একাত্তর টিভি চালু হওয়ার পরই মানুষ তার নাম জানে। আর সামিয়া রহমানকে একজন বিতর্কিত সাংবাদিক হিসেবেই জানে মানুষ। গবেষণা চুরিতে ধরা খাওয়ার পর তার আসল চেহেরা বেরিয়ে এসেছে। আরেকজনের লেখা চুরির অভিযোগে গণমাধ্যম অঙ্গন থেকে তাকে বহিস্কার করারও দাবি উঠেছে।

 

অনেকে আবার বলছেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জাফর ইকবালের শিষ্য হলেন সামিয়া রহমান। জাফর ইকবালই প্রথম বিদেশি লেখকদের বই অনুবাদ করে নিজের নামে ছাপিয়ে বিজ্ঞান লেখক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। আর সামিয়া রহমান যেহেতু জাফর ইকবালের একান্ত শিষ্য, তাই তার পক্ষেও অন্যের লেখা চুরি করে নিজের নামে ছাপানো সম্ভব। জাফর ইকবাল ও সামিয়া রহমানরা একই নীতি আদর্শের লোক।

 

অপরদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাফর ইকবাল বিদেশি কাহিনীর অনুকরনে, ছায়া অবলম্বনে বই লিখে নিজের নামে চালিয়ে দিয়ে আসছেন বহুদিন ধরে। কিন্তু, বইয়ের কোথাও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেননা তিনি।

যেমন জাফর ইকবালের চুরি করা কয়েকটি বই হলো-

আসল- অ্যালিয়েন (১৯৭৯): জাফর ইকবাল নাম দিয়েছেন ট্রাইটন একটি গ্রহের নাম (১৯৮৮)।

আসল- পিচ ব্ল্যাক (২০০০): জাফর ইকবাল নাম দিয়েছেন অবনীল (২০০৪)।

আসল- ম্যাটিল্ডা (১৯৮৮, বই) (১৯৯৬, চলচ্চিত্র): জাফর ইকবাল নাম দিয়েছেন নিতু আর তার বন্ধুরা (১৯৯৯)।

আসল- বেবি’জ ডে আউট (১৯৯৪)। জাফর ইকবাল নাম দিয়েছেন মেকু কাহিনী (২০০০)।

আসল- আ চাইল্ড কলড “ইট” (১৯৯৫) : জাফর ইকবাল নাম দিয়েছেন আমি তপু (২০০৫)।

 

এভাবে জাফর ইকবাল বিদেশি লেখকদের লেখা বিজ্ঞান বিষয়ক, গল্প, নাটক, সিনেমার কাহিনী সহ বিভিন্ন বই বাংলা অনুবাদ করে তার নিজের নামে ছাপিয়েছেন।

 

বিশিষ্টজনেরা মনে করছেন, অপরের লেখা চুরি করে নিজের নামে ছাপিয়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন জাফর ইকবাল। আর সামিয়া রহমান যেহেতু জাফর ইকবালের শীষ্য তাই গুরুকেই তিনি অনুসরণ করেছেন।

 

...........................................................................

রিলেটেড নিউজঃ

সামিয়ার বিরুদ্ধে এবার এডওয়ার্ড সাঈদের লেখা চুরির অভিযোগ

শুধু মিশেল ফুকোই নয়, মার্কিন দার্শনিক অধ্যাপক এডওয়ার্ড সাঈদের একটি নিবন্ধ থেকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষক সামিয়া রহমান ও মাহফুজুল হক মারজান লেখা কপি করেছেন বলে অভিযোগ পেয়েছে ঢাবি কর্তৃপক্ষ। সাঈদ একাডেমি অব প্যালেস্টাইন থেকে এ অভিযোগ করা হয় বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে। সূত্রটি জানিয়েছে, এডওয়ার্ড সাঈদের ‘কালচার অ্যান্ড ইমপেরিয়ালিজম’ এর ‘টু ভিশন ইন হার্টনেস অব ডার্কনেস’, ‘কনসোলিডেটেড ভিশন’, এবং ‘ওভারলেপিং টেরোরিস্ট, ইন্টারউইন্ড হিস্টোরিস্ট’ আর্টিকেল থেকেও লেখা কপি করা হয়েছে।

 

অভিযোগে বলা হয়, ঢাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সামিয়া রহমান এবং ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক মাহফুজুল হক মারজানের লেখা ‘এ নিউ ডাইমেনশন অব কলোনিয়ালিজম অ্যান্ড পপ কালচার: এ কেস স্ট্যাডি অব দ্যা কালচারাল ইমপেরিয়ালিজম’ আর্টিকেলের ৮৯, ৯০ ও ৯১ পৃষ্ঠায় এডওয়ার্ড সাঈদের ‘কালচার অ্যান্ড ইমপেরিয়ালিজম’ এর ৫, ৬, ৬৬, ৬৭, ৬৮ এবং ১১৯ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে কপি করা হয়েছে।

 

এর আগে অভিযোগ ওঠে, ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর ‘দ্যা সাবজেক্ট অ্যান্ড পাওয়ার’ নামের একটি আর্টিকেল থেকে সামিয়া রহমান ও মারজান লেখা চুরি করেছেন। ১৯৮২ সালের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নাল ‘ক্রিটিক্যাল ইনকোয়ারি’র ৪ নম্বর ভলিউমের ১৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ফুকোর এই আর্টিকেলটি প্রকাশিত হয়েছিল। সামিয়া ও মারজানের আর্টিকেল ‘এ নিউ ডাইমেনশন অব কলোনিয়ালিজম অ্যান্ড পপ কালচার: এ কেস স্ট্যাডি অব দ্যা কালচারাল ইমপেরিয়ালিজম’ গত বছর ডিসেম্বরে ঢাবির সোশ্যাল সায়েন্স রিভিউ নামের একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়।

 

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সামিয়া রহমান শুক্রবার বলেছেন, এই নিবন্ধটি লেখা থেকে শুরু করে প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত এর সঙ্গে তার কোনও সংশ্লিষ্টতাই ছিল না। যা করার তার সবই ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক মারজান তাকে না জানিয়েই করেছেন। ঘটনার সব দায় তিনি মারজানের ওপরই চাপিয়েছেন। শনিবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকালে সামিয়া রহমানকে ফোন করা হলে তিনি তা ধরেননি। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের হেড অব কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স পদে কর্মরত রয়েছেন।

 

এডওয়ার্ড সাঈদের নিবন্ধ থেকে কিছু অংশ ব্যবহার করার বিষয়ে ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক মাহফুজুল হক মারজান শনিবার বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অভিযোগ এলে তো কিছু বলার নাই। তদন্ত কমিটি তদন্ত করবে, আমাকে কমিটির মুখোমুখি হতে হবে। যা বলার সেখানেই বলবো। বিষয়টির সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান জড়িত। তদন্তাধীন বিষয়ে আমি এর বেশি কিছু বলতে চাই না।’ সামিয়া রহমানের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তিনি হয়ত আমার ওপর রাগ করেছেন। তিনি তো আমার শিক্ষক, মায়ের মতো।’

 

এদিকে, প্রশ্ন উঠেছে প্রকাশিত নিবন্ধটি যারা রিভিউ করে প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন তাদের তদন্তের মুখোমুখি করা হবে কি না। কারণ, রিভিউয়ার নিবন্ধটি কিসের ভিত্তিতে প্রকাশের অনুমতি দিলেন সেটাও খতিয়ে দেখা উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

 

ঢাবির শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সিন্ডিকেট সদস্য মাকসুদ কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘সামিয়া রহমান ও মারজানের বিরুদ্ধে কপি-পেস্টের যে অভিযোগ এসেছে, তার কোথায় কোথায় কোন পদ্ধতি ব্যবহার করে কপি করা হয়েছে তা খতিয়ে দেখবো। এটা খতিয়ে দেখতে এবং সঠিকভাবে তদন্তের স্বার্থে কমিটির সদস্যদের সম্মতিক্রমে যদি মনে হয় নিবন্ধটির শুধু লেখক নয়, রিভিউয়ার ও সম্পাদককেও তলব করা প্রয়োজন, তাহলে সেটা করবো।’

 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শাওলী মাহবুব বলেন, ‘কোনও লেখক নিবন্ধ লিখতে অন্য কোনও লেখকের বক্তব্য বা তথ্য ব্যবহার করতেই পারেন। তবে অবশ্যই রেফারেন্সিংয়ের সঠিক নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রেফারেন্সিংয়ের দুটি নিয়ম রয়েছে। একটি প্যারাফ্রেজিং এবং অন্যটি কোট। প্যারাফ্রেজিং পদ্ধতি হচ্ছে অপর লেখকের বক্তব্যের মূল অর্থ অপরিবর্তিত রেখে নিজের মতো করে লেখা। তবে সেই বক্তব্যের শেষে অবশ্যই সঠিক নিয়মে লেখকের নাম, সাল এবং পাতার নম্বর ব্যবহার করতে হবে। অন্যদিকে, কোট করে লিখতে হলে ওই লেখকের বক্তব্য হুবহু লিখে লেখক ও বইয়ের নাম কোটেশন মার্কের মধ্যে আবদ্ধ করতে হয়। তবে কোট বা প্যারাফ্রেজিং, যা-ই করা হোক অন্য লেখকের বক্তব্যটুকু উল্লেখ করার পর সাইডনোটে বা ফুটনোটে অথবা বইয়ের শেষে অ্যাপেন্ডিক্সে তথ্যসূত্র (সাইটেশন) উল্লেখ করতেই হবে। অন্যথায় তা চৌর্যবৃত্তির মধ্যে পড়বে।’

 

গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাবির সিন্ডিকেট গবেষণা ও নিবন্ধে লেখা চুরির অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ঢাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সামিয়া রহমান এবং ক্রিমিনোলজি বিভাগের মাহফুজুল হক মারজান ছাড়াও ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের তিন শিক্ষক রুহুল আমিন, নুসরাত জাহান ও বদরুজ্জামান ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ ওঠে।

 

 

 


প্রতিদিনের খবরগুলো ফেসবুকে পেতে নিচের লাইক অপশনে ক্লিক করুন-

Logo

সম্পাদক: পল্লব মুনতাকা। জ্যাকম্যান, মেডওয়ে, ইউএসএ
ইমেইল: mail.newsevent24@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | newsevent24 2017