সমাজে বখাটে বাড়ছে, বখাটেদের কাছে সমাজ জিম্মি হচ্ছে

নিউজ ইভেন্ট২৪

১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৪:১১

মমতাজ উদ্দিন

মমতাজ উদ্দিন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

মূলত ১২-১৩ উর্ধ্ব কিশোর থেকেই অনেক উঠতি তরুণ অজ¯্র কারণে বখে যেতে থাকে। বর্তমানে এই প্রবণতা মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়ছে। কোনো কোনো বাবা-মার অনাদরে আবার কেউ বা অতি আদরে বখে যাচ্ছে। কেউ বা প্রাথমিক স্কুলে লেখাপড়ার দুর্বল ভিত্তির কারণে মাধ্যমিকের লেখাপড়া ধরতেই পারছে না, লেখাপড়া তাদের কাছে ভীতিকর বিষয় হয়ে পড়ে। মাধ্যমিকের গ-ি পার হওয়া এদের অনেকেরই সম্ভব হয় না, হলেও তাতে বাবা-মা বা সমাজের কেউই খুশি হয় না।

 

এরা এ সময়ে বিদ্যাবিমুখ হয়ে সঙ্গী খোঁজে, পেয়েও যায় গ্রামে-গঞ্জে অনেককে, শহরেও তাই। বিদ্যা শিক্ষায় অমনোযোগীরা খেলা-ধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ইত্যাদি কোনো কিছুতেই তার কোনো কাজের আগ্রহের স্ফুরণ ঘটানোর সুযোগ পায় না, সেভাবে নিজেদের বিকশিত করার সুযোগ পায় না। ফলে এরা খুঁজে নেয় গোপন আড্ডা- যেখানে ধুমপান, নেশাজাতীয় টেবলেট সেবন ধীরে ধীরে শুরু হয়। পিতামাতা বা অভিবাবকদের থেকে প্রথমে আবদার, তাতে সুবিধা না হলে চুরিতে হাত পাকানো হয়। আড্ডায় স্কুলের মেয়েদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

পিতামাতারা এদের ক’জনকে ফিরিয়ে আনতে পারেন- জানি না। তবে গ্রামে-গঞ্জে খোঁজ নিলে দেখা যাবে লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশই এই বয়সে বখে যায়, এলাকায় শিস দিয়ে বেড়াতে অভ্যস্ত হয়ে উঠে, বড় ভাইদের সঙ্গে ভিড়ে চাঁদাবাজি করার বিদ্যা রপ্ত করে ফেলে, এক খানা মোটরসাইকেল কিনতে পারলে ছেলে হোক মেয়ে হোক তাদের সম্মুখে নিজেদের শক্তি, ক্ষমতা ও দাপট দেখানোর চেষ্টা করে থাকে। স্কুল ডিঙিয়ে কলেজের দরজায় ঢুকতে পারলে ওই ছেলেতো এলাকার ‘রাজা’ বলেই নিজেকে নিজে জাহির করতে শুরু করে। যোগ দেয় ছাত্র সংগঠনে। লেখাপড়ার বাকি পাঠের বিদায় ঘটলেও দাপুটে নেতাকে কেনা ভয় পায়! এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য, থানা-পুলিশ, সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সর্বত্রই তার ঠেক দেওয়ার অবাধ লাইসেন্স যেন পেয়ে যায়।

 

যে সমাজে এভাবে বখাটে কিশোরদের একটি অংশ বেড়ে ওঠে, যা খুশি তা করতে পারে, তরুণ হওয়ার ‘সুযোগ’ পায় সে দেশে কিশোর-তরুণদের মধ্যে মেধার বিকাশের চাইতে গু-া, বদমায়েশ, বখাটে, সন্ত্রাসী, মদখোর, অপরাধীর সংখ্যা বেশি না হোক সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কাজে লিপ্ত হতে পারে এমন তরুণ বা যুবকের সংখ্যা দিন শেষে বাড়বেই- এতে কোনো দ্বিধা থাকার কারণ নেই। বখে যাওয়া ছেলেদের বেশিরভাগই এলাকায় জোরজবরদস্তিতে হাত পাকায়, নিজ গ্রামে শিশু কন্যাদের শরীর ছিড়ে ছুঁড়ে খেতে দ্বিধা করে না, গলা টিপে হত্যা করতেও হাত কাঁপে না। আর একটু বড় হলে তো কথাই নেই প্রকাশ্যেই মেয়েদের তুলে নিতে গ্যাংস্টার হতে চায়, পকেটে টাকা কড়ি বেশি এসে গেলে পছন্দের যে কোনো মেয়েকে নিয়ে তার চিত্তরঞ্জনের বাসনা জাগে।

 

মেয়ের মা-বাবা, ভাই-বোন ও সব তার কাছে তেলাপোকা মনে হয়- যাদের টিপে টিপে মেরে ফেলার আনন্দ তার ভেতরে বাসা বাঁধে। কেন এ সব এক সময়ের মা-বাবার আদরের দুলাল এমন পৈশাচিত আচরণে বেড়ে উঠলো তা না বোঝেন বেশির ভাগ মা-বাবা, না বোঝেন নিকট আত্মীয়-স্বজন, না পারে শিক্ষা ব্যবস্থা যুক্তির শিক্ষায় শিক্ষিত করতে।

যে বখাটে ছেলেটি শিশুর মধ্যে তার যৌন বাসনা পূরণের জন্য হামলে হয়ে পড়ে সে জানেই না যৌন ক্রিয়া কী? পশু-পাখি, জীব-জন্তুওতো অসম কোনো বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে যৌনাকারের চেষ্টা করে না। অথচ কোনো অপ্রাপ্ত বয়স্ক কন্যা শিশু-কিশোরীকে যারা তাদের ইচ্ছা পূরণের লক্ষ্য হিসেবে ভাবে- তারা পশুর চাইতেও খারাপ স্তরে অবস্থান করে। এদের বেশির ভাগের মধ্যেই এক ধরনের বিকৃত মানসিকতা বেড়ে ওঠে- যা তারা কখনো মনে মনে হলে সংশোধন করার চেষ্টা না করে বরং ধর্ষক, যৌন নির্যাতনকারী, হত্যাকারীর মতো ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। দেখা যাচ্ছে, উঠতি বখাটেরা দলবদ্ধ হয়ে কোনো একটি কন্যা শিশুর ওপর তাদের বিকৃত লালসার চরিতার্থ করতে যায়, এক পর্যায়ে শিশুকে মেরে বা লাশ গুম করে বাঁচার চেষ্টা করে।

 

কিন্তু বিষয়টি শেষ পর্যন্ত জানাজানি হয়, থানা-পুলিশ, বিচারালয় হয়ে জেল, ফাঁসি পর্যন্ত গড়ায়। বিষয়টি কোনো পিতামাতার জন্য সুখকর নয়। সব পিতামাতার কাছেই সন্তান জন্ম নেওয়ার পর কত স্বপ্ন চোখে মুখে থাকে। কিন্তু সেই সন্তান যখন ১২-১৩ বছর বয়স থেকেই বখে যেতে থাকে, নানা অপরাধ কর্মকা-ে যুক্ত হতে থাকে, হত্যা, খুন, ধর্ষণ, গু-ামী, মাস্তানি, ইভটিজিংকারী, মাদকসেবী ইত্যাদি নানা খারাপ পথে চলে যায় তখন অনেকেরই জীবন মাটির পৃথিবীর উপরেই যেন শেষ হয়ে যায়, আবার অনেক অভিভাবকই এ সবে তেমন কিছু মনে করেন না, গ্রামাঞ্চলে এমন ‘দাপুটে’ ছেলের জন্য ‘গর্ব’ ও করেন তখন বিস্মিত হতে হয়। বখে যাওয়া অনেক ছেলের অভিভাবকের কারণেও এর নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ও এর জন্য কম বেশি দায়ী।

 

সমাজটাই কমবেশি এর জন্য খুব বেশি শান্তিতে নেই। এর জন্য প্রয়োজন প্রতিটি ছেলেমেয়েকে মানবিক যৌক্তিক বোধে বেড়ে ওঠার ব্যবস্থা করা, জীবনের সব কিছু নিয়ে বৈজ্ঞানিক ধারণা দেওয়া, মানুষরুপে গড়ে ওঠা, নারী-পুরুষের মিলিত জীবন জীবনের নিয়মেই গড়ে তোলা যায়, সুখী হওয়া যায়।

লেখক: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

 

 


প্রতিদিনের খবরগুলো ফেসবুকে পেতে নিচের লাইক অপশনে ক্লিক করুন-

Logo

সম্পাদক: পল্লব মুনতাকা। জ্যাকম্যান, মেডওয়ে, ইউএসএ
ইমেইল: mail.newsevent24@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | newsevent24 2017