জার্মানিতে উচ্চশিক্ষায় পড়ার জন্য যা করতে হবে

নিউজ ইভেন্ট ২৪ ডটকম/আর

১৪ জুলাই ২০১৭,শুক্রবার, ২১:৩৯

 

জার্মানিতে খুব ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টিউশন ফি নেই বলে এখানে অনেক দেশ থেকে প্রচুর শিক্ষার্থী পড়তে আসেন। সেটা যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপের অন্যান্য দেশ, মধ্যপ্রাচ্য আর এশিয়াতো আছেই। তবে জার্মানিতে শুধু কেবল উচ্চশিক্ষা মূল লক্ষ্য হলে শুধু ইংরেজি দিয়ে চালিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু প্রফেশনাল চাকরি অসম্ভব। জার্মানিকে বলা হয় ল্যান্ড অব টেকনোলজি। এখানে যাদের কম্পিউটার সায়েন্স, প্রোগ্রামিং, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে প্যাশন আছে তাদের সম্ভাবনা খুব ভালো। সে ক্ষেত্রেও ভাষার দক্ষতা বি২ বা সি১ লাগে।

আমাদের পাশের দেশ ভারতে ছেলেমেয়েদের স্কুল থেকে বিদেশি ভাষা শেখানো হয়। তাদের একটা কম্পিউটার সায়েন্সের ব্যাচেলর শিক্ষার্থী অনেক আগে থেকে জার্মানি আসার পরিকল্পনা মাথায় রেখে প্রতি সেমিস্টারে জার্মান ভাষার কিছু ক্রেডিট করেন। ব্যাচেলর পড়া চলাকালেই অনলাইনে জার্মানির চাকরির বাজার বা ইন্টার্নশিপের খোঁজ নিজেকে সেই মাপকাঠি বা যোগ্যতা অনুযায়ী প্রস্তুত করেন। তাই সরাসরি ব্যাচেলরের পর ইন্টার্নশিপ শেষ করে চাকরির সুযোগও পেয়ে যান মাস্টার্স না করেই। জার্মান অনেক ছেলেমেয়ে আউসবিল্ডুং করে চাকরিতে যোগ দেয়। আমরা যাকে আমাদের দেশে বলি ডিপ্লোমা। এদের অনেক লোক আইসবিন্ডুং করে যাদের উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার মতো এত মেধা নেই। দেশে যেমন গবেষক লাগে তেমনি শ্রমিকও লাগে। শতভাগ গবেষক বা শ্রমিক দিয়ে দেশ চালানো যায় না। তাই বিদেশে ডিপ্লোমা পড়ারও সুযোগ আছে। এখানে এক বছর ফ্রিতে কোনো বাসায় বেবিসিটার বা বাচ্চা দেখাশোনা করে মেয়েদের নার্সিংয়ে ডিপ্লোমা পড়ার সুযোগ আছে। নেপালের অনেক মেয়ে ভাষা শিখে এসে এখানে নার্সিংয়ে ডিপ্লোমা পড়ছেন। অন্য দিকে মাস্টার্সে যারা আসেন ব্যাচেলর থেকে, আগেই বি২ হয়ে গেলে এখানে এসে পার্টটাইম চাকরি পেতেও সুবিধা।

ক্যানটিনে শিক্ষার্থীরাক্যানটিনে শিক্ষার্থীরা

কিছু সাবজেক্টে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলেও চাকরির সম্ভাবনা জার্মানিতে একেবারেই নেই, ভাষা না জানলে। যেমন সাংবাদিকতার কথা যদি বলি, খুব ভালো সুযোগ পড়াশোনার। কিন্তু সংবাদমাধ্যম হলো ভাষার খেলা, সেখানে ইংরেজি দিয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা গেলেও চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্র খুব সীমিত। একই রকম আর্কিটেক্ট বা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের বেলায়। ইংরেজি ও জিআরই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির সুযোগ পাওয়া গেলেও জার্মানিতে জার্মান লাগবে। আর যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে অনেক টিউশন ফি। সে ক্ষেত্রে স্কলারশিপ আগেই ব্যবস্থা করতে হয়। কেননা স্কলারশিপ খুব সীমিত। জিআরই বা আইইএলটিএস স্কোর মোটিভেশন প্রমাণে পাবলিকেশন লাগে স্কলারশিপ পেতে। তাই উচ্চশিক্ষা বিনা বেতনে জার্মানিতে হলে ভাষা জানা থাকলে অনেক দার উন্মোচন হয়ে যায়।

মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের ছেলেমেয়েদের জন্য বলব খুব ভালো করে জানার সুযোগ আছে। পরিবেশ নিয়ে জানতে হলে ইউরোপের গবেষণা রিসার্চ এখনো বিশ্ব সেরা। এখানে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদেরও সারা দিন মেশিন নিয়ে বসে বসে শিখতে হয়। বিজনেসের ছেলেমেয়েদের ব্যাচেলর পড়ার সময় বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ করতে হয়। যাতে বাস্তবজীবনে প্রয়োগের দক্ষতা ও যোগ্যতা গড়ে ওঠে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গাছ নিয়ে মাঠে ল্যাবে এক্সপেরিমেন্ট চালাতে হয় হাতে কলমে শিক্ষার জন্য। ইউরোপের ইউনিভার্সিটিগুলোতে পড়াশোনা অনেক শেখার সুযোগ আছে, সেটা পরবর্তী জীবনে কাজে লাগানো যায়। তবে এখানে ভাষা ছাড়া চাকরির সম্ভাবনা খুব কম। আবার যারা ব্যাচেলর করতে আসেন, ভাষা শেখার পর তাদের চাকরি বা ক্যারিয়ারে খুব ভালো করার সুযোগ আছে। কিন্তু শুরুটা তাদেরও খুব সহজ না। তাই উচ্চশিক্ষায় আগ্রহীদের ভাষা শেখা ও প্রস্তুতি শুরু করা উচিত স্কুল থেকে।


চাকরি বা পড়াশোনায় এখানে প্রতিযোগিতা সব দেশের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। যাদের আগে থেকে অনেক ভালো ব্যাকগ্রাউন্ড বা বেসিক ভালো। যেমন চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এমনকি ইউরোপের অন্য দেশ থেকেও ছেলেমেয়েরা জার্মানিতে আসে। আবার জার্মানি থেকে অন্য দেশে যারা যায় তাদেরও অন্য ভাষার পরীক্ষা দিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র হলে জিআরই বা ইউরোপের ফ্রান্স বা ব্রিটেন হলে ফ্রেঞ্চ ও ইংলিশ লাগে। কেননা এখন গ্লোবালাইজেশনের যুগ। আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য উচ্চশিক্ষা গবেষণা সবকিছুতে ভাষার আদানপ্রদান খুব জরুরি। কেননা একা একটা দেশ তার নিজের ভাষা নিয়ে আগাতে পারে না। ভাষা শেখা শুধু আমাদের দেশের জন্য নয় সারা বিশ্বের মানুষের জন্য চ্যালেঞ্জ। ব্রিটেনে স্কুলে শিশুদের ফ্রেঞ্চ ও জার্মান ভাষা শেখানো হয়। ভারতে বেশির ভাগ মানুষ কমপক্ষে দুই-তিনটি ভাষা জানে। কারণ দেশে ১০০ টির মতো ভাষা। এক প্রদেশের মানুষ অন্য প্রদেশের মানুষের সঙ্গে হিন্দি আর ইংরেজিতে কথা বলে।

প্রবাস জীবনে আরেকটি দিক হলো, প্রবাসে পড়াশোনা ও জীবন দেশের মতো নয়। রান্না, কাটাকাটি বা বাসন ধুয়ে ঘরদোর পরিষ্কার করে দেওয়ার জন্য কোনো কাজের বুয়া নেই। সব নিজেকেই করতে হয়। তা সে কোনো সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো রাজকন্যা হোক বা কোনো মিলিয়নিয়ারের মেয়ে হোক। ইউনিভার্সিটিতে পড়তে হলে সে ডর্মে থাকুক বা বাড়িতেই থাকুক—রান্না, বাজার, ঘরদোর, বাথরুম, বেসিন, রান্নাঘর, ময়লার বালতি পরিষ্কার সবকিছু নিজেরই করতে হয়।

আর রাস্তার মোড়ে মোড়ে আমাদের দেশের মতো রেস্টুরেন্ট পাওয়া যায় না, যেখানে ক্লাসের ফাঁকে একটু খেয়ে নেওয়া যায়। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ভেবে নিতে হয় সকালে কি খেয়ে ক্লাসে যাব আর সে খাওয়াটা ঘরে আছে কিনা। ঘুম ভেঙে ওভেনে বা টোস্টারে ব্রেড ঢুকিয়ে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নিজের তৈরি হয়ে নিতে হয়। প্রবাসে সবকিছু ঠিক সময় মতো করতে পারা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এখানে বাস, ট্রেন সব ঘড়ি ধরে চলে। এক মিনিট এদিক-ওদিক হওয়ার উপায় নেই।

ডরমিটরিডরমিটরি

আবার সারা দিনের জন্য বাইরে গেলে বা ক্লাসে থাকলে খাওয়ার, কফির মগ, পানির বোতল সব ব্যাগে ভরে নিতে হয়। কেননা চাইলেই রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে চা খেয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের এত বড় ক্যাম্পাসে একটি মাত্র ক্যানটিন রয়েছে। সেখানে দুপুরে খাবার এবং চা কফির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সে খাবার পয়সা দিয়ে কিনতে হয়। আমি খুব খিদে নিয়েও পুরোটা খেতে পারিনি কোনো দিন এই এক বছরে।

আর ক্যাম্পাসে ওয়ান টাইম কাপ বা মগ অতিরিক্ত বর্জ্য তৈরি করে বলে একে খুব নিরুৎসাহিত করা হয়। তাই সবাই ঘর থেকে বাইরে যাওয়ার আগে একটা ব্যাগপ্যাক পিঠে ঝুলিয়ে তাতে পানির বোতল, কফির মগ, জুস, চকলেট এবং সঙ্গে দুপুরের খাওয়ার ভরে নিয়ে বেরিয়ে পরেন। ক্লাস, লাইব্রেরি, পড়াশোনা, পার্টটাইম কাজ—সব করে ঘরে এসে আবার চলে পরদিনের প্রস্তুতি। এখানে টানা চার ঘণ্টা করে ক্লাস। দিনে আট ঘণ্টা বা তার বেশিও ক্লাস করতে হতে পারে। যদি পাশাপাশি ভাষা শেখা বা অন্য কোনো ক্লাস থাকে। শহর-বাজার, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোথাও রিকশা নেই। ছেলে মেয়ে, ছোট বড় সবাই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন আর বাসস্টপ বা ট্রেন স্টেশনের পাশে সাইকেল রাখার ভালো ব্যবস্থা থাকে সব জায়গাতে।

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ঘরগুলোতে ইচ্ছে মতো ফার্নিচার, কার্পেট, সোফা বা নানা রকম পেইন্টিং দিয়ে সাজানোর সুযোগ আছে। কিন্তু ঘরে থাকার মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ার পর আবার ঘর ধুয়ে মুছে রং করে দিয়ে যেতে হয়। আমার জার্মানিতে গত অক্টোবরে এক বছর হলো। ডরমিটরিতে আমার ঘরের মেয়াদ শেষ হলে আমাকেও ঘরে রং করে দিতে হয়েছে। বিদেশে বাসা খুঁজে পাওয়া—সে আরেক বিপদ। আমি খুব চিন্তায় ছিলাম কীভাবে সব করব। একা ঘরের ফার্নিচার সাত তলা-আট তলায় টেনে তোলা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। এখানে বন্ধুরা খুব সাহায্য করে। আমার ঘরের রং করা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই আমাকে তারা বারবার জিজ্ঞেস করেছে কি সাহায্য লাগবে। একজন বন্ধু তো একা একা নিচতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত একটা ছোট ফ্রিজ টেনে তুলে নিয়ে পৌঁছে দিয়ে গেল। জার্মান মেয়েরা আমাকে বাসার জন্য অ্যাপ্লিকেশন লিখতে ও বাসা খুঁজে পেতে অনেক সাহায্য করেছে।

এখানকার ছেলেমেয়েগুলো দেখতে খুব শুকনো কাঠি কাঠি ও রোগা-পাতলা দেখা গেলেও এদের কর্মক্ষমতা যে অনেক বেশি, সেটা পার্টটাইম কাজ করতে গেলেই টের পাওয়া যায়। প্রথম দিকে খুব কষ্ট হতো। এখন আস্তে আস্তে শিখে নিয়েছি অনেকটা এই এক বছরে। আর এখানে সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো সেটা দিনে কি মাঝ রাতে। প্রকৃতির রং-রূপ ও খুব ভালো করে উপলব্ধি করা যায় অদ্ভুত এক ভাষা রয়েছে এর। যেটা শহরের কোলাহলে পাওয়া যায় না।

এত দায়িত্ব আর ব্যস্ততা হয়তো শুনতে খুব কঠিন মনে হচ্ছে। কিন্তু এগুলো আমাকে নিজের দায়িত্ব নিতে শিখিয়েছে। জার্মানিতে পড়তে এসে আমার মনে হয়েছে এখানে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। ধনী-গরিব সবাই সমান, সাদার ওপরে কালো বা কালোর ওপরে সাদার কোনো বৈষম্য নেই।

ডরমিটরিতে সহপাঠীর সঙ্গে লেখিকাডরমিটরিতে সহপাঠীর সঙ্গে লেখিকা

উচ্চশিক্ষা পরিকল্পনা যে দেশেই হোক, দেশে ফিরে আসা আর সেখানে চাকরি খোঁজা দুই রকম প্রস্তুতি লাগে। সুতরাং উচ্চশিক্ষা শেষ করে চাকরির প্রত্যাশা থাকলে প্রস্তুতি নিতে হবে স্কুল থেকে। সেটা ইউরোপ বা আমেরিকা যেটাই হোক। আইইএলটিএসে হুট করে ৭ পাওয়া যায় না বা জিআরই-এর কাঙ্ক্ষিত স্কোর পেতে লম্বা সময় প্রস্তুতি দরকার। তাহলে জেনে বুঝে হোক প্রবাসে সফল উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ার।

এ বিষয়ে বিস্তারত জানতে ভিজিট করুন জার্মান প্রবাসে ওয়েবসাইট: <www.germanprobashe.com>

ফেসবুক <www.facebook.com/groups/BSAAG>

 

 

 


প্রতিদিনের খবরগুলো ফেসবুকে পেতে নিচের লাইক অপশনে ক্লিক করুন-

Logo

সম্পাদক: পল্লব মুনতাকা। জ্যাকম্যান, মেডওয়ে, ইউএসএ
ইমেইল: mail.newsevent24@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | newsevent24 2017