নিত্যপণ্যের দাম বাড়ালে আল্লাহ শাস্তি দেবেন

নিউজ ইভেন্ট ২৪ ডটকম/আর

২৮ মে ২০১৭,রবিবার, ২৩:২০

যুবায়ের আহমাদঃ রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। রমজান যতই কাছে আসে, নিত্যপণ্যের দাম ততই লাগামহীন হয়। ব্যবসায়ীদের লুটেরা মনোভাবের কারণে যুক্তিগ্রাহ্য কারণ না থাকলেও বাড়ানো হয় নিত্যপণ্যের দাম। মজুদকরণের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ইবাদতের মাসকে তারা পরিণত করেন ‘মুনাফার’ উৎসবের মাস।

অসাধু ব্যবসায়ীরা হয়তো মনে করছেন, দেশের জনসাধারণকে ফাঁকি দিয়ে তারা নিজেদের খুব লাভ বয়ে আনছেন। এ ধারণা একেবারেই ভুল। কারণ বাহ্যিকভাবে তারা মানুষ ঠকালেও প্রকৃত অর্থে তারা নিজেদেরই ঠকাচ্ছেন। কোটি কোটি সাধরণ ভোক্তার অধিকার তারা নষ্ট করছেন। এ তো হক্কুল ইবাদ (বান্দার হক)। যারা আল্লাহর বান্দাদের কষ্ট দিয়ে ‘বড়লোক’ হওয়ার আশায় মজুদদারি করেন, আল্লাহতায়ালা তাদের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন খাদ্য মজুদ রাখল সে আল্লাহ থেকে সম্পর্কহীন হয়ে গেল, (মুসনাদে আহমাদ: ৮/৪৮১)। দুনিয়ার সামান্য ‘লাভ’ করতে গিয়ে কেউ যদি আল্লাহতায়ালার সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়ে পড়ে তার চেয়ে হতভাগা আর কে আছে? মজুদদার হয়তো ভাবছেন, তিনি বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে বেশি লাভ করে কোটিপতি হবেন। কিন্তু লাভ কী? আখিরাতের পাশাপাশি তিনি তার দুনিয়াকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। কারণ মজুদদারির মাধ্যমে কোটিপতি হলেও তার ভেতরের জগতে গজব ও দারিদ্র্য অবধারিত। হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেউ যদি খাদ্য গুদামজাত করে কৃত্রিম উপায়ে সংকট তৈরি করে আল্লাহ তাকে দুরারোগ্য ব্যাধি ও দারিদ্র্য দিয়ে শাস্তি দেবেন। (ইবনে মাজা: ২/৭২৯)।

পক্ষান্তরে যারা মজুদদারি না করে স্বাভাবিকভাবে মুনাফা অর্জন করতে চান আল্লাহ তাদের ব্যবসায় বরকতের দরজা খুলে দেন। তার লাভ অল্প হলেও তা হালাল। তাতে থাকবে আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত বরকত ও সমৃদ্ধি।

হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সুবোধ ব্যবসায়ী রিজিকপ্রাপ্ত হয় আর পণ্য মজুদকারী অভিশপ্ত হয়। (ইবনে মাজা: ২/৭২৮)। মজুদদার হারাম পথে বেশি উপার্জন করে লাভ কী? একজন মানুষ হারাম উপার্জন করলেই বেশি ভোগ করতে পারবে না; যতটুকু আল্লাহ তার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন ততটুকুই সে লাভ করবে। আমাদের আশপাশের কৃত্রিম ধনীরা এখানে ওখানে লোক দেখানো দান-সদকা করে দানশীলতার সুনাম কুড়ান। অথচ তারাই অন্যদিকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জনগণকে জিম্মি করে রাখছেন। কোটি মানুষের অসৎ টাকায় ভারী হচ্ছে তাদের পকেট। মানুষের হক মেরে, কোটি মানুষকে কৌশলে জিম্মি করে উপার্জিত হারাম টাকার দান-সদকা কোনো কাজে আসবে না।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারিম (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি অবৈধভাবে সম্পদ সঞ্চয় করে এরপর তা দান করবে, সে এ দানের জন্য কোনো প্রতিদান পাবে না বরং তাতে পাপ ভোগ করতে হবে তাকে। (ইবনু হিব্বান: ৮/১১)। এমনকি কোনো মজুদদার যদি তার সমুদয় সম্পত্তিও দান করে দেয় তবু তার গুনাহ মাফ হবে না।

হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন নবীজি (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি (কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর জন্য) ৪০ দিন পর্যন্ত কোনো জিনিস গুদামজাত করে রাখবে, তার এত মারাÍক গুনাহ হবে যে এই সমুদয় সম্পদ দান করে দিলেও তার গুনাহ মাফের জন্য যথেষ্ট হবে না। (মিশকাত: ২৭৭২)। পক্ষান্তরে হারাম পথ অবলম্বন না করে হালাল উপার্জন থেকে অল্প দান করলেও আল্লাহর কাছে এর মর্যাদা অনেক।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারিম (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন থেকে একটি খেজুর পরিমাণ দান করবে (আল্লাহর কাছে তা এতই প্রিয় হবে যে) আল্লাহ একে তার কুদরতি ডান হাতে কবুল করবেন। এরপর একে দাতার জন্য তোমাদের কারো অশ্বশাবককে প্রতিপালন করার মতো প্রতিপালন করতে করতে পাহাড় পরিমাণ বড় করবেন (পাহাড় পরিমাণ দানের সওয়াব দান করবেন)। (বোখারি: ২/১০৮)। সিন্ডিকেটে জড়িত থেকে আল্লাহর বান্দাদের কষ্ট দিয়ে রমজানে ইবাদত করা, দান-খায়রাতের অভিনয় করা রমজানের সঙ্গে উপহাস করা ছাড়া কিছুই নয়। মূলত দুনিয়ার জীবনে একটু বেশি সম্পদ উপার্জনের নেশাই (‘আরও চাই’ প্রবণতা) তাদের অন্যায় কাজের দিকে ঠেলে দেয়। অথচ সে হালাল পন্থায় থাকলেও তার জন্য নির্ধারিত সম্পদ তার কাছে আসবেই। হারাম পথে গিয়েও সে নির্ধারিত অংশের চেয়ে বেশি ভোগ করতে পারবে না কখনও।

হজরত জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির উদ্দেশ্য হবে কেবল দুনিয়া অর্জন, আল্লাহ তার কাজকে এলোমেলো বিক্ষিপ্ত করে দেবেন। পেরেশানি সৃষ্টি করে দেবেন। সম্পদের পাহাড় থাকলেও তার দু’চোখের সামনে দারিদ্র্য এনে দেবেন (‘আরও চাই আরও চাই’ প্রবণতা তাকে পাগল করে তুলবে)। অথচ পার্থিব সম্পদ সে ততটাই লাভ করতে পারবে, যতটা আল্লাহ তার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন। আর যার উদ্দেশ্য হবে আখিরাতপ্রাপ্তি আল্লাহতায়ালা তার সবকিছুকে পরিপাটি গোছাল করে দেবেন। তার জীবন সুশৃঙ্খল হয়ে উঠবে। তার অন্তরে মুখাপেক্ষিহীনতা ঢেলে দেবেন। দুনিয়া তার পিছু পিছু ঘুরে বেড়াবে। (ইবনে মাজা: ২/১৩৭৫)। পবিত্র কোরআনুল কারিমে এরশাদ হয়েছে, ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে। এমনকি তোমরা কবরে পৌঁছে যাওয়া পর্যন্ত।’ (সূরা তাকাসুর: ১-২)।

একজন ব্যবসায়ী যদি মজুদদারির মতো হারামের পথ ছেড়ে হালাল পথে ব্যবসা করে তা হলে একদিকে যেমন আল্লাহ তার জন্য সমৃদ্ধির দরজা খুলে দেবেন, অন্যদিকে হালাল ব্যবসার পুরস্কার হিসেবে হাশরের ময়দানে নবী ও শহীদদের সঙ্গী হয়ে ধন্য হবেন তিনি।
লেখক : প্রাবন্ধিক

 

 


প্রতিদিনের খবরগুলো ফেসবুকে পেতে নিচের লাইক অপশনে ক্লিক করুন-

Logo

সম্পাদক: পল্লব মুনতাকা। জ্যাকম্যান, মেডওয়ে, ইউএসএ
ইমেইল: mail.newsevent24@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | newsevent24 2017