ল’ইয়ার মানেই কি “লায়ার”?

নিউজ ইভেন্ট ২৪ ডটকম/আর

১৩ মে ২০১৭,শনিবার, ২১:৩৭

মাহদিয়া রহমান বুশরাঃ আইনজীবীদের সমন্ধে সমাজে নানারকম কথা প্রচলিত। যেমন: " Lawyer মানেই Liar , যার নাই কোনও গতি নেই সে করে উকালতি, বটতলার উকিল" ইত্যাদি। আইনজীবীদের ব্যপারে অনেকে এরকম সরলীকরণও করে থাকেন। পেশায় একজন আইনজীবী হওয়ায় তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম ব্যাপারটা ঠিক। বাস্তবেই এমন বহু আইনজীবী আছেন যারা ঘটনাকে বিকৃত করেন এবং আইনের সঠিক বিধানটি উল্লেখ না করে আদালতকে বিভ্রান্ত করেন। আবার কোনও কোনও আইনজীবী তাদের মক্কেলদের মিথ্যা আশ্বাস পর্যন্ত দিয়ে থাকেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো- “গুটিকতক Lawyer এর এমন গর্হিত দুষ্কর্মের জন্যে পুরো আইনজীবী সমাজকেই কি ‘Liar’ আখ্যা দেওয়া উচিত?” ‘Individual person has individual responsibility’- কোনও ব্যক্তি বিদেশে অপরাধ করলে কি সেই ব্যক্তি দায়ী না হয়ে পুরো সমাজ বা রাষ্ট্র দায়ী হয়ে যাবে? একইভাবে কোনও আইনজীবী মিথ্যা বললে কি সকল আইনজীবী বা পুরো আইন পেশাকেই দায়ী করা যাবে?

সকলেই একমত হবেন যে, চিকিৎসা পেশার মূলমন্ত্র ‘সেবা’। অথচ সেই মহান পেশাতে নিয়োজিত কতিপয় ব্যক্তি আজ অসহায় মানুষের জন্যে কতটা বৈরি আর ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছেন তা ভাবতেও গা ঘিনঘিন করে!! তাই বলে কি চিকিৎসক আর চিকিৎসা পেশাকে কসাই ও কসাইগিরি বলে সরলীকরণ করা উচিত?’

তেমনিভাবে শিক্ষকতা এক মহান পেশা। কতিপয় অনৈতিক শিক্ষকের কারণে কি পুরো পেশাকেই অনৈতিক বলা ঠিক হবে?

আসুন একটি গল্প শোনা যাক। সৌরভ, বাবা মায়ের অতি আদরের একমাত্র সন্তান। তার পরিবারটি সুখে ভরপুর। কিন্তু বিধি বাম!! কী ভাগ্য নিয়ে সে এসেছিল যে পাঁচ বছর বয়সেই তাকে মাতৃ-পিতৃহীন হতে হলো। অসহায় দিন যাপন করতে লাগল এই ছোট্ট ছেলেটি। আর এদিকে তার বাবার বিশাল সম্পত্তির ওপর নজর পড়ল তারই আপন চাচা নাজিমউদ্দিনের। চাচা তাকে যে করেই হোক ঘরছাড়া করবেনই। নানা ফন্দি তার মাথায় আসে। অবশেষে জোরপূর্বক তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় আর সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দখল করে নেন ওই কূট পরিকল্পনাকারী চাচা।

এদিকে অল্প বয়সে মাতৃ-পিতৃহীন এই অবুঝ-অসহায় নিষ্পাপ ছেলেটির ঠাঁই হলো রাস্তায়। যে ছেলেটি প্রতিদিন স্কুলে যেত বই হাতে, আজ তার হাতে ভিক্ষার থলে। বাড়ি থেকে বাড়ি, রাস্তা থেকে রাস্তায় যখন সে ভিক্ষা করতে যায়, তখন তার বন্ধুরা স্কুলে যায় বই নিয়ে। হৃদয় তার ভেঙে চৌচির হয়ে যায়। অসহায় মানবতার করুণ আর্তনাদ ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয় আকাশে বাতাসে। বাতাস থেমে যায় তার স্বাভাবিক বয়ে চলা থেকে, পৃথিবীর আলো যেন নিভে যায়। তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে, কোনও উপায় না পেয়ে হন্যে হয়ে সে ঘুরে বেড়ায় রাস্তায় রাস্তায়। তার স্বপ্নগুলো কেমন যেন নিঃশেষ হয়ে যেতে থাকে।

দু’দিন যাবত তার কোনো খাবার নেই। দাঁড়ানোর শক্তি পর্যন্ত সে হারিয়ে ফেলে। ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হয়ে সে পার্শ্ববর্তী এক রুটির দোকানে রুটি চায়। কিন্তু দোকানি তাকে রুটিতো দেয়ই নি, বরং বার বার রুটি চাওয়ায় ছোট্ট এই নিষ্পাপ ছেলেটিকে মেরে চুরির অপবাদ দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এক মাস যাবত সৌরভ পৃথিবীর আলো বাতাসহীন এক আবদ্ধ কুঠুরিতে সারাক্ষণ বাবা মায়ের কথা ভেবে কান্নায় বুক ফাটায়। ছোট্ট এই অবুঝ শিশুটির কান্নায় বাতাস যেন ভারি হয়ে ওঠে।

অতঃপর একদিন একটি ‘মানবাধিকার সংগঠন’ তার সন্ধান পায়। অনেক কষ্টে তারা তার জামিনের ব্যবস্থা করে। সে আবার দেখতে পায় পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্য। এই সংগঠনটিতে কাজ করে ২০ জন বিজ্ঞ আইনজীবী। তারা সৌরভের কাছ থেকে জানতে পারে সেই নির্মম ও হৃদয়বিদারক কাহিনি। অতঃপর তারা সেই সম্পত্তি উদ্ধারকল্পে মামলা দায়ের করে কোর্টে। বিজ্ঞ আদালত তার সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে রায় দেন তার পক্ষে। ফলে সম্পত্তি তার দখলে আসে।

মসজিদ থেকে কিছুক্ষণ আগে আজানের আওয়াজ ভেসে এলো। পাখির কিচির-মিচির শব্দে ঘুম ভাঙল সৌরভের। নামায পড়ে সে সৃষ্টিকর্তার কাছে হাত তুলে প্রার্থনা করে- যেন বড় হয়ে একজন বিজ্ঞ আইনজীবী হতে পারে। আর ফিরিয়ে দিতে পারে অসহায়-দুখী মানুষের অধিকার। সৌরভ আজ স্কুলে যাচ্ছে বন্ধুদের সাথে। মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় আজ সে স্বাধীন। অভাবের সেই তীব্র যন্ত্রণাদায়ক কষ্ট আজ আর নেই তার মনে। মুক্ত মনে আজ সে পড়াশোনা করছে। আজ সে সুখী। মহাসুখী। এর পরও কি বলবেন lawer মানেই liar??

এটা নিছকই একটি গল্প। কিন্তু আমাদের সমাজেও রয়েছে এমন অনেক আইনজীবীর উদাহারণ। যারা আসোলেই আইনের সঠিক ব্যবহার করেন। আইন প্রয়োগ করে সমাজের অসহায় মানুষগুলিকে তাদের ন্যায্য পাওনা ফিরিয়ে দেন। ভালো মানুষ আছে বলেই না এই পৃথীবিটা এখনও টিকে আছে।

ভালো মন্দের অবস্থান বরাবরই পাশাপাশি। আমাদেরই উচিত মন্দটাকে বর্জন করে ভালোটাকে গ্রহণ করা। আর ভালো মানুষদের প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করা। যেন সামনের দিকেও তারা ভালো কাজগুলি করে যেতে পারে।

মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয় যখন আশেপাশে শিক্ষিত (??) মানুষগুলি আমার পেশা শুনেই নাক সিটকয়। ভাবখানা এমন যে, আইন পেশার মত বাজে পেশা আর এই সমাজে নেই। আবার কেউ কেউ তো বলেই ফেলেন- “তোমার বাবা একজন প্রিন্সিপাল হয়ে কী করে তোমাকে আইনজীবী বানালো?” অনেকে তো আরও এক ডিগ্রি বেশি যায়। তারা রীতিমত আমার পরকাল নিয়ে টানাটানি শুরু করে দেন। তাদের ভাষ্যমতে, যেহেতু আমি একজন আইনজীবী এবং আমার একমাত্র কাজই হলো মিথ্যা বলা তাই পরকালে আমার জাহান্নাম নিশ্চিত।

প্রথম প্রথম খুব রেগে যেতাম, তর্ক করতাম। এখন আর তা করি না। চুপচাপ শুনে যাই এবং সঠিক সময়ের অপেক্ষা করি। মজার কথা হলো যারা আমার পেশা নিয়ে অনেক আজেবাজে কথা বলেছেন ইতোমধ্যে তাদের অনেককেই আমার শরণাপন্ন হতে হয়েছে এবং তারা বুঝতে পেরেছেন আইন এমন একটি পেশা যেখানে মিথ্যা বলার কোনও সুযোগই নেই। আইনের বাহিরে একটিও কথা বলার সুযোগ নেই আমাদের। আমরা যা বলি আইনের মধ্যেই বলি। শুধুমাত্র একটু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলি। এই আর কি!

সব ল'ইয়াররা লায়ার নয়। সবাই আইনকে বিকৃত করে না। অল্প কিছু খারাপ মানুষের জন্য আমরা নিশ্চয় পুরো আইনজীবী সমাজকে দায়ী করতে পারি না??

আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখব, আইন মেনে চলব এবং আইনজীবীদেরকে প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা দিবো।

লেখক: আইনজীবী, হাইকোর্ট

 

 


প্রতিদিনের খবরগুলো ফেসবুকে পেতে নিচের লাইক অপশনে ক্লিক করুন-

Logo

সম্পাদক: পল্লব মুনতাকা। জ্যাকম্যান, মেডওয়ে, ইউএসএ
ইমেইল: mail.newsevent24@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | newsevent24 2017