মাদকের ভয়াল গ্রাস টার্গেট যখন শিশু

নিউজ ইভেন্ট ২৪ ডটকম

১৩ মে ২০১৬,শুক্রবার, ২০:৫১

দৃশ্যপট ১ :

রাজধানীর ধানমন্ডি ৩ নম্বর রোডের বাসিন্দা শাহজালাল। পেশায় একজন ব্যাংকার। ব্যাংকার স্ত্রী সাবিহা ও পাঁচ বছরের ছেলে অনিককে নিয়ে ছোট সংসার তার। ছেলে অনিক ক্লাস টুতে পড়াশোনা করে ধানমন্ডির একটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে। অন্য সব দিনের মতোই বাড়ি ফিরে ব্যাংকার দম্পতি দেখতে পান তাদের আদুরে শিশু বেড রুমে ইজি চেয়ারে বসে সিগারেট জ¦ালিয়ে ধোঁয়া উড়াচ্ছে। বাবা একটু ধমকের স্বরে জানতে চাইলে ছেলে অনিকের সোজা উত্তর বাবা আমি শাহরুখ খান। দম্পতির আজ বুঝার অপেক্ষা রইল না ছেলে প্রিয় তারকাকে অনুসরণ করতে গিয়েই এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
দৃশ্যপট ২ :
রাজধানীর একটি খ্যাতনামা হাসপাতালে পরিবারের সবার অপেক্ষা নতুন অতিথির মুখটি দেখার জন্য। বাংলাদেশে অবস্থানরত একটি দাতা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জেবিন খান (৩৪) প্রথমবারের মতো মা হতে যাচ্ছেন। অপেক্ষার প্রহর শেষে খবর এলো একটি ফুটফুটে মেয়ে সন্তান হয়েছে তার। সবার মধ্যে যখন আনন্দের বন্যা বইছে তখনই খবর এলো নবজাতককে আইসিইউতে নিতে হবে শ^াসজনিত সমস্যার কারণে। বিষয়টি তেমন কোনো সিরিয়াস নয় ভেবেছিল পরিবারের সদস্যরা কিন্তু জন্মের দুই দিনের মাথায় শিশুটির অকাল মৃত্যু পুরো পরিবারের সব আনন্দ ম্লান করে শোকে ভাসিয়ে ফেলে। চিকিৎসকেরা জানান, মেয়েটির মৃত্যুর অন্যতম কারণ ছিল গর্ভে থাকা অবস্থায় মায়ের ধূমপান না ছাড়া।
দৃশ্যপট ৩ :
বনানীর ১৭ নম্বর রোডে বেশ ক’টি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে শাখা ক্যাম্পাস। রোডটিতে রয়েছে বেশ ক’টি সিগারেটের দোকান, যা সন্ধ্যা গড়তেই পরিণত হয় বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রির স্পটে। তবে দুঃখের বিষয় হলেও সত্যি এ রোডটির মাদক আর তামাকজাত পণ্য বিক্রি আর সেবনের বেশির ভাগই শিশু বা কিশোর। সামিউল নামের সাত বছর বয়সী এক শিশু জানায়, গুলশানের টিঅ্যান্ডটি বস্তি থেকে ইয়াবা ও গাঁজা এনে এই সড়কে বিক্রি করছে প্রায় তিন মাস। প্রতিদিন বিক্রি হয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। বস্তির বড় ভাই মিনহাজকে টাকা জমা দিলে সামিউলকে রোজ হিসেবে ৩০০ টাকা দেয়া হয়। আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়ানোর জন্যই রাজধানীসহ সারা দেশে তামাক ও মাদক বিক্রিতে শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানান এর সাথে সংশ্লিষ্টরা। আর মাদক ব্যবসার পাশাপাশি এসব সামিউলরাই পরিণত হয় মাদসেবীতে।
দৃশ্যপট ৪ :
রাজধানী উত্তরার স্কলাস্টিকা স্কুলের রাস্তা ঘেঁষেই লাল রঙের টিশার্ট পড়া দুই কিশোর-কিশোরী। বয়স আনুমানিক ১৫-১৬। দু’জনই একটি বিদেশী ব্র্যান্ডের সিগারেটের ব্র্যান্ড প্রোমোটার হিসেবে কাজ করছে। স্কুলের শিক্ষার্থীদের বুঝানোই তাদের প্রধান কাজ যে তাদের ব্র্যান্ড শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। খুবই লাইট সিগারেট। সবাই খেতে পারে। আর এইসব তথাকথিত লাইট ব্র্যান্ডের সিগারেটের প্যাকেটে দাম পর্যন্ত লেখা থাকে না। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেশি দাম নিতেও কার্পণ্য করছে না ব্র্যান্ড প্রমোটরেরা। তাদেরই একজনের সাথে আলাপকালে জানান, এ স্কুলের সবাই বড়লোকের সন্তান, তাই বিক্রিও ভালো। যদিও সিগারেটের সব ধরনের প্রচার-প্রচারণা নিষিদ্ধ করেছে সরকার।
দৃশ্যপট ৫ :
একটি মাল্টিন্যাশনাল টোবাকো প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক অনুষ্ঠানের সংবাদ গণমাধ্যমে যাতে প্রকাশ বা প্রচার না হয় সেজন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালালাম। প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের সাথে সরাসরি এবং টেলিফোনে কথাও বললাম। তাদের অনেকেই আশ^স্ত করে বলল, যেহেতু তামাকজাত পণ্যের সাথে এখন বিজ্ঞাপনের কোনো সম্পর্ক নেই কাজেই এ সংবাদ প্রচারে আমরা বাধ্য নই। বিজ্ঞাপন বিভাগ থেকেও কোনো চাপ আসবে না। আর সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমরা এ সংবাদটি প্রচার বা প্রকাশ করব না। কিন্তু অবাক করার বিষয় বেশির ভাগ গণমাধ্যমেই প্রচার-প্রকাশ হলো সেই প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক অনুষ্ঠানের সংবাদ। তবে একেই কী বলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা? পরে অনেকের সাথে টেলিফোনে আলাপকালে তারা জানান, ওপর থেকে নির্দেশ ছিল সংবাদটি ছাপার বা প্রচারের।
ওপরের পাঁচটি ঘটনা বিচ্ছিন্ন হলেও এসবের একই সূত্রতা খুঁজে পাওয়া যায়। আর তা হলো দেশে মাদক বা তামাকের ভয়াল ছোবলের প্রধান টার্গেটেই রয়েছে শিশু-কিশোরেরা। তবে কোন পথে এগোচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, একবারও কি আমরা তা ভেবে দেখছি? প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ দুই ক্ষেত্রেই তামাক আর মাদকের প্রধান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে শিশু আর কিশোর-কিশোরীরা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা অন্তত দেড় কোটি। পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, মাদকসেবীরা গড়ে প্রতিদিন অন্তত ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন করে থাকে। যার বাজার মূল্য মাসে ৬০০ কোটি টাকা। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন-২০০৫ সংশোধন করা হলে এখনো এই আইনের সুফল ও যথাযথ প্রয়োগ চোখে পড়ে না। প্রকাশ্যে ধূমপান করলে ধূমপান নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী ৩০০ টাকা জরিমানা আদায়ের বিধান থাকলেও এর বাস্তব প্রয়োগ নেই। হরহামেশাই শিশুদের কাছে তামাকজাত পণ্য বিক্রির দৃশ্য চোখে পড়ছে। আর বর্তমান সময়ে স্মার্টনেসের অংশ হিসেবে তরুণীরাও আসক্ত এই ভয়াবহ মাদকে। মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ‘প্রিভিলেন্স অব মেন্টাল ডিজঅর্ডার, এপিলেপসি, মেন্টাল রিটার্ডেশেন অ্যান্ড সাবস্টেন্স অ্যাবিউজ অ্যামাং চিলড্রেন অব ঢাকা ডিভিশন’ শীর্ষক জরিপ দেখা গেছে ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সী মেয়েরাই মাদকে বেশি আসক্ত। রাজধানী শহর ঢাকায় মাদকাসক্ত শিশুর ১৭ শতাংশই মেয়ে। নানাবিধ অসঙ্গতি, সামাজিক অবকাঠামোগত নিরাপত্তাহীনতাই মেয়েদের মাদকে আসক্ত করছে বলেও জরিপে উল্লেখ করা হয়।
লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
sumonpress@gmail.com

 

 

 


প্রতিদিনের খবরগুলো ফেসবুকে পেতে নিচের লাইক অপশনে ক্লিক করুন-

Logo

সম্পাদক: পল্লব মুনতাকা। জ্যাকম্যান, মেডওয়ে, ইউএসএ
ইমেইল: mail.newsevent24@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | newsevent24 2017